প্রকাশিত:
৩০ জুন ২০২৫, ১৩:৪০
প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছেন, ইরানের পারমাণবিক স্থাপনাগুলোর একাধিক অংশ ‘সম্পূর্ণ ধ্বংস’ করে দিয়েছেন। গত সপ্তাহান্তে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের তিনটি পারমাণবিক স্থাপনায় হামলা চালিয়েছে। তবে এই হামলার প্রকৃত প্রভাব ও ইরানকে পরমাণু অস্ত্র তৈরির পথ থেকে কতদিন পিছিয়ে দেওয়া গেছে, তা নিয়ে এখনও প্রশ্ন থেকে গেছে। ইসরায়েল ও ইরানের মধ্যে টানা ১২ দিনের সংঘর্ষ ঘটে। এই সংঘাত পুরো মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা তৈরি করেছিল।
এই সংঘাতের পরে নতুন করে সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে, কোন কোন দেশ পারমাণবিক অস্ত্রের মালিক এবং এই অস্ত্রগুলো কোথায় সংরক্ষিত রয়েছে? মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরায়েলসহ নয়টি দেশের কাছে পারমাণবিক অস্ত্র রয়েছে বলে ধারণা করা হয়। যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার হাতে রয়েছে বিশ্বের ৮৭ শতাংশ পারমাণবিক অস্ত্র
ধারণা করা হয়, ৮৭ শতাংশ পারমাণবিক অস্ত্রের মালিক যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়া। স্টকহোম ইন্টারন্যাশনাল পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউট (এসঅঅইপিআরআই) ও ফেডারেশন অব আমেরিকান সায়েন্টিস্টস (এফএএস)-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের শুরুতে বিশ্বে ৯টি দেশের কাছে প্রায় ১২ হাজার ২৪১টি পারমাণবিক ওয়ারহেড (ক্ষেপণাস্ত্র) রয়েছে বলে জানা যায়।
এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি রয়েছে রাশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের হাতে। ধারণা করা হয়, বাকি সাতটি দেশ—ব্রিটেন, ফ্রান্স, চীন, ভারত, পাকিস্তান, উত্তর কোরিয়া ও ইসরায়েল মিলে মোট অস্ত্রের ১৩ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ করে।
অনেক পারমাণবিক ওয়ারহেডের মেয়াদ শেষ হয়ে গেলেও সেগুলো নিষ্ক্রিয় করা হয়নি। প্রায় ৯ হাজার ৬১৪টি ওয়ারহেড সক্রিয় সামরিক ব্যবহারের জন্য সংরক্ষিত, যার মধ্যে ৩ হাজার ৯১২টি মোতায়েনকৃত কৌশলগত ও অ-কৌশলগত ওয়ারহেড হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ করা হয়েছে।
অর্থাৎ এসব ওয়ারহেড আন্তঃমহাদেশীয় ক্ষেপণাস্ত্র, ভারী বোমারু ঘাঁটি বা স্বল্প-পাল্লার অস্ত্রবাহী ঘাঁটিতে সক্রিয় অবস্থায় আছে। পারমাণবিক অস্ত্রধারী দেশগুলো তাদের সঠিক অস্ত্রের সংখ্যা গোপন রাখে, ফলে গবেষকরা অনুমানভিত্তিক তথ্য প্রকাশ করে। কেবল যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেন ও ফ্রান্স প্রকাশ্যে তাদের পারমাণবিক অস্ত্রের সংখ্যা জানিয়েছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এই স্বচ্ছতা কমেছে বলেও সতর্ক করে এসঅঅইপিআরআই।
মধ্যপ্রাচ্যের একমাত্র পরমাণু শক্তিধর দেশ বলে ধারণা করা ইসরায়েলকে, তবে তারা কখনো পরমাণু অস্ত্র থাকা বা না থাকার বিষয়টি নিশ্চিত করেনি।
তবে এফএএস অনুযায়ী, ইসরায়েলের হাতে প্রায় ৯০টি পারমাণবিক অস্ত্র রয়েছে। ফেডারেশন অব আমেরিকান সায়েন্টিস্টস (এফএএস) জানিয়েছে, তাদের হিসাব উন্মুক্ত সূত্র, ঐতিহাসিক রেকর্ড বিশ্লেষণ এবং কিছু সময় ফাঁস হওয়া তথ্যের ওপর ভিত্তি করে তৈরি করা হয়েছে এবং তা অন্যান্য গবেষণা সংস্থা ও পর্যবেক্ষকদের হিসাবের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ।
কোন কোন দেশে পারমাণবিক অস্ত্র সংরক্ষিত আছে?
যদিও ৯টি দেশ পরমাণু অস্ত্রের মালিক, তবে আরো ৬টি দেশ নিজেদের মাটিতে অন্য দেশের পারমাণবিক অস্ত্র রাখতে দিয়েছে। এর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের হয়ে ৫টি এবং রাশিয়ার হয়ে একটি দেশ। ন্যাটোর নিউক্লিয়ার শেয়ারিং চুক্তির অধীনে যুক্তরাষ্ট্র তার কিছু পরমাণু অস্ত্র ইতালি, জার্মানি, নেদারল্যান্ডস, তুরস্ক ও বেলজিয়ামে সংরক্ষণ করেছে। আন্তর্জাতিক নিউক্লিয়ার নিরস্ত্রীকরণ সংগঠন আইসিএএন বলছে, এসব দেশে যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় ১০০টি পারমাণবিক অস্ত্র সংরক্ষিত আছে।
যদিও অস্ত্রগুলো সম্পূর্ণভাবে যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে, তবু এসব মিত্র দেশে রাখা এই অস্ত্র যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা অঙ্গীকারকে বোঝায়। যুক্তরাজ্যের রয়্যাল ইউনাইটেড সার্ভিসেস ইনস্টিটিউট-এর নিউক্লিয়ার পলিসি পরিচালক লুকাশ কুলেসা বলেন, ‘এই অস্ত্র সংরক্ষণ একদিকে যেমন প্রতিরক্ষার নিশ্চয়তা দেয়, তেমনি ওই দেশগুলোর নিজস্ব অস্ত্র অর্জনের প্রলোভনও কমিয়ে দেয়।’ তিনি বলেন, ‘যদি অন্যদেশের মাটিতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এই অস্ত্র থাকে, তাহলে এই দেশগুলো তাদের নিজস্ব পারমাণবিক অস্ত্র কেনার কথা বিবেচনা করবে না।’
২০২৩ সালের মার্চে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন জানান, তিনি প্রতিবেশি বেলারুশে কৌশলগত পারমাণবিক অস্ত্র সংরক্ষণের পরিকল্পনা করেছেন। এর তিন মাস পরে জুনে বেলারুশের প্রেসিডেন্ট আলেকজান্ডার লুকাশেঙ্কো জানান, তাদের দেশে রাশিয়ার অস্ত্র আসতে শুরু করেছে। তবে এসআইপিআরআই ও আইসিএএন বলছে, এই অস্ত্রগুলো বাস্তবে বেলারুশে রয়েছে কি না—সেই বিষয়ে এখনও নির্ভরযোগ্য প্রমাণ নেই।
নতুন পারমাণবিক অস্ত্র প্রতিযোগিতার শঙ্কা
ঠাণ্ডা যুদ্ধের সময় বিশ্বে মোট পারমাণবিক অস্ত্রের সংখ্যা ৭০ হাজার ছাড়িয়েছিল। এরপর বহু বছর ধরে সংখ্যা কমে আসছিল। কিন্তু বর্তমান বৈশ্বিক সংঘর্ষ ও নিরাপত্তাহীনতায় নতুন করে অস্ত্র বৃদ্ধির আশঙ্কা দেখা দিচ্ছে। এসআইপিআরআই-এর ২০২৫ সালের প্রতিবেদনে প্রতিষ্ঠানটির পরিচালক ড্যান স্মিথ সতর্ক করে বলেন, ‘আগের চেয়ে বেশি জটিল ও বিপজ্জনক নতুন পারমাণবিক প্রতিযোগিতা শুরু হতে যাচ্ছে।’
লুকাশ কুলেসা জানান, এখনকার ৯টি পারমাণবিক শক্তিধর দেশগুলোর বেশিরভাগই মনে করে, পারমাণবিক অস্ত্র তাদের নিরাপত্তা নীতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবে তিনি সতর্ক করেন, ইসরায়েলের অস্ত্র ভাণ্ডার জেনে রেখেও হামলা হয়েছে, রাশিয়ার হুমকির পরও ইউক্রেনকে পশ্চিমা দেশগুলো সামরিক সহায়তা দিয়েছে—এগুলো প্রমান করে, পারমাণবিক অস্ত্র থাকলেই নিরাপত্তা নিশ্চিত হয় না।
তিনি বলেন, ‘রক্ষা ব্যবস্থা যত বাড়ানো হচ্ছে, অপর পক্ষ সেটা দেখে নিজেদের অস্ত্র আরো বাড়ানোর যৌক্তিকতা খুঁজে পাচ্ছে। ফলে প্রতিরক্ষা বাড়ানোর সিদ্ধান্ত একরকম অস্ত্র প্রতিযোগিতার চক্র তৈরি করছে।’ বিশ্ব এখন এমন এক সংকটময় মুহূর্তে দাঁড়িয়ে, যেখানে পারমাণবিক নিরস্ত্রীকরণ নয়, বরং নতুন অস্ত্র সংগ্রহ ও প্রদর্শনের প্রতিযোগিতা উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে।
মন্তব্য করুন: